প্রকাশিত: Fri, Apr 14, 2023 6:39 AM আপডেট: Mon, Jan 26, 2026 11:00 AM
মুক্তিযুদ্ধ থেকে স্বাস্থ্যে যুদ্ধে ডা. জাফরুল্লাহ
লেলিন চৌধুরী : ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর জন্ম ১৯৪১ সালের ২৭ ডিসেম্বর। ২০২৩-১১ এপ্রিল রাত ১০.৪০-এ প্রয়াত হলেন তিনি। তাঁর মহাকাব্যিক জীবনের রঙ্গমঞ্চে নেমে এলো চিরযবনিকা। ডা. চৌধুরীর জীবনের দুটি পর্ব। প্রথম পর্বটিতে রয়েছে স্কুল ও কলেজ জীবনের পড়াশোনা। তারপর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হওয়া। ১৯৬৪ সালে তিনি এমবিবিএস পাস করেন। তারপর চলে যান লন্ডনে। তখনকার লোকজন বলতো, বিলেত বা বিলাত। তার জীবনের দ্বিতীয় পর্বটি শুরু হয় ১৯৭১ সালে ভারতের ত্রিপুরার আগরতলায়। জীবনের দ্বিতীয় পর্বেই তিনি হয়ে উঠেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তবে তাঁর জীবনের প্রথম পর্বটি নিঃসন্দেহে দ্বিতীয় পর্বে প্রবেশের পূর্ব-প্রস্তুতিকাল। রাজনীতিতে জাফরুল্লাহর হাতেখড়ি হয় ছাত্রজীবনেই। মেডিক্যাল কলেজে পড়ার সময় তিনি ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। সেসময় তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সক্রিয় কর্মী। ঘটনাবহুল মেডিক্যাল ছাত্রজীবন শেষ হয় ১৯৬৪ সালে এমবিবিএস পাস করার মধ্য দিয়ে।
১৯৬৭ সালে তিনি এফআরসিএস (ফেলো অব রয়েল কলেজ অব সার্জনস) প্রথম পর্ব পাস করেন। এফআরসিএস হলো জেনারেল ও বিশেষায়িত সার্জারির একটি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। তাঁর এফআরসিএস, চূড়ান্ত পর্বের পরীক্ষার নির্ধারিত সময় ছিলো ১৯৭১ সাল। লন্ডনে তিনি কেতাদুরস্ত চাক্যচিক্যময় জীবন যাপন করতেন। দামি ব্রান্ডের সার্ট-প্যান্ট, স্যুট-টাই পড়তেন, চড়তেন দামি গাড়িতে। ১৯৬৯ থেকেই সারাদেশে উত্তাল হতে শুরু করে। উত্তালতা ক্রমশ গণভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ঢাকা থেকে সে ঢেউ আছড়ে পড়ে লন্ডনে। সত্তরের নির্বাচন। বাঙালির কুলপ্লাবী বিজয়। ১৯৭১ গৌরবোজ্জ্বল মহান মুক্তিযুদ্ধের শুরু। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও বন্ধুরা যুক্তরাজ্যের বাঙালি ডাক্তারদের নিয়ে গঠন করেন ‘বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ), ইউ কে’। বিএমএ, ইউকের মহাসচিব নির্বাচিত হন ডা. জাফরুল্লাহ। প্রবাসী বাঙালিদের নিকট থেকে অর্থ সাহায্য সংগ্রহ করে তা দিয়ে ওষুধ এবং অস্ত্রশস্ত্র কিনে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য পাঠাতে থাকেন। তারপর একপর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেন তিনি নিজেই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিবেন।
১৯৭১ সালের মে মাসে তিনি এবং তাঁর বন্ধু ডা. মোবিন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য ভারতের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। এর আগে এপ্রিল মাসে লন্ডনের বিখ্যাত হাইড পার্কে এক সভায় জনসম্মুখে তিনি পাকিস্তানি পাসপোর্ট ছিঁড়ে ফেলেন। তাই ভারতীয় দূতাবাস থেকে সংগ্রহ করা বিশেষ ‘ট্রাভেল পারমিট’ নিয়ে বিমান ভ্রমণ করছিলেন। নানা বিপদআপদ কাটিয়ে মে মাসের শেষদিকে তাঁরা দুজন আগরতলায় পৌঁছাতে সক্ষম হন। জাফরুল্লাহ চৌধুরী মেলাঘরে গেরিলা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
এরপর ডা. মোবিনকে সঙ্গে নিয়ে গড়ে তুলেন বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল। এ সময়ে জাফরুল্লাহর জীবনে একটি মোড় পরিবর্তন ঘটে। চাক্যচিক্যময় বিলাসী জীবন তাঁর কাছে অর্থহীন মনে হতে থাকে। স্বাধীন বাংলাদেশে ‘বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল’ রূপান্তরিত হয়ে ‘গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র’ এ পরিণত হয়। সাধারণ মানুষের জন্য ‘সমাজভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলার নতুন প্রয়াস নিয়ে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র কাজ শুরু করে। রোগ চিকিৎসার চেয়ে রোগ প্রতিরোধই উত্তম। এজন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রধান লক্ষ্য হলো সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই কেবলমাত্র কার্যকর প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
১৯৭৮ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আল মাতা ঘোষণা তৈরির অন্যতম একজন ছিলেন তিনি। এই ঘোষণার মূল প্রতিপাদ্য ছিলো ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য ২০০০ সালের মধ্যে’। এই ঘোষণা বাস্তবায়নের প্রয়াসে বিশ্বের স্বাস্থ্য সেবায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে। ১৯৮২ সালের জাতীয় ওষুধ নীতি প্রণয়নে ডা. জাফরুল্লাহর প্রধান ভূমিকা ছিলো। জাতীয় ওষুধ নীতি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে দেশীয় ওষুধ শিল্পের বিকাশের পথ সুগম হয়। একে একে গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যালস, গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিক্যাল কলেজ, গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতাল এবং এই হাসপাতালের ডায়ালাইসিস সেন্টার ও অঙ্গ প্রতিস্থাপন কেন্দ্র স্থাপনে তিনি উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেশের অতিদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষ জন্য স্বল্পমূল্যে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার দ্বার খুলে যায়।
দীর্ঘদিন যাবৎ তিনি কিডনি রোগে ভুগছিলেন। সপ্তাহে তিনদিন ডায়ালাইসিস করাতে হতো। এ অবস্থাতেই তিনি সারা দেশে এমনকি দুর্গম চরাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা বিস্তারে কাজ করছেন। নিজ মতপ্রকাশে তিনি ছিলেন অকুতোভয়। তাঁর সবমতের সঙ্গে আমরা অনেকে একমত হইনি। কিন্তু চূড়ান্ত বিশ্লেষণে তিনি সাধারণ মানুষের পক্ষে ছিলেন। সাধারণজনের স্বাস্থ্যের উন্নয়ন ঘটানো ছিল তাঁর জীবন-প্রয়াস। এখানেই তিনি মহীরূহসম বিশাল এবং তুলনাহীন। এই কর্মবীরের প্রতি অতল শ্রদ্ধা, অনিঃশেষ ভালোবাসা। লেখক: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ
আরও সংবাদ
চ্যাম্পিয়ন ভারত : একটা ছোট মুহূর্ত কতো বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে
‘ওই ক্যাচ হয়নি, সুরিয়াকুমারকে আবার ক্যাচ ধরতে হবে’!
কতো দেশ, কতোবার কাপ জিতলো, আমাদের ঘরে আর কাপ এলো না!
সংগীতাচার্য বড়ে গোলাম আলি খান, পশ্চিমবঙ্গের গর্ব সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ও আমি
ইন্ডিয়ান বুদ্ধিজীবী, ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ও দেশের বুদ্ধিজীবী-অ্যাক্টিভিস্ট
মতিউর প্রতিদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ৮৩ ব্যাচের বন্ধুদের গ্রুপে সৎ জীবন যাপনের উপদেশ দিতেন!
চ্যাম্পিয়ন ভারত : একটা ছোট মুহূর্ত কতো বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে
‘ওই ক্যাচ হয়নি, সুরিয়াকুমারকে আবার ক্যাচ ধরতে হবে’!
কতো দেশ, কতোবার কাপ জিতলো, আমাদের ঘরে আর কাপ এলো না!
সংগীতাচার্য বড়ে গোলাম আলি খান, পশ্চিমবঙ্গের গর্ব সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ও আমি
ইন্ডিয়ান বুদ্ধিজীবী, ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ও দেশের বুদ্ধিজীবী-অ্যাক্টিভিস্ট